ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ সামনে রেখে – নির্বাচন কমিশন কর্তৃক মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়া ইতোমধ্যেই জনমনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাস্তবতা হলো, মনোনয়ন বাতিল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের নির্বাচন আইন ও সাংবিধানিক কাঠামোরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে মনোনয়ন বাতিলের কারণ ও এর বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার সম্পর্কে সচেতনতা না থাকলে প্রার্থী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
মনোনয়ন বাতিলের প্রধান আইনগত কারণ
১. ঋণখেলাপি সংক্রান্ত অযোগ্যতা
Representation of the People Order, 1972-এর অনুচ্ছেদ ১২(১)(খ), (ল) ও (ম) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি হিসেবে বিবেচিত হন, তবে তিনি সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হবেন। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থী প্রকৃত অর্থে ঋণখেলাপি না হওয়া সত্ত্বেও CIB (Credit Information Bureau) ডাটাবেজে ভুলভাবে নাম অন্তর্ভুক্ত থাকার কারণে মনোনয়ন বাতিল হয়।
২. হলফনামা ও তথ্যগত ত্রুটি
মনোনয়নপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত হলফনামায়—
- সম্পদের বিবরণ
- আয়কর রিটার্ন
- ফৌজদারি মামলা
- পেশা ও আয়-ব্যয়ের তথ্য
সঠিকভাবে উল্লেখ না থাকলে অথবা নোটারি/ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে যথাযথভাবে স্বাক্ষর না হলে মনোনয়ন বাতিল হওয়া সম্পূর্ণ আইনসম্মত।
৩. প্রক্রিয়াগত ত্রুটি
নির্ধারিত সংখ্যক প্রস্তাবক ও সমর্থকের স্বাক্ষর না থাকা, রাজনৈতিক দলের অনুমোদনপত্র সংযুক্ত না করা, কিংবা নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করে মনোনয়ন দাখিল করাও বাতিলের অন্যতম কারণ।
৪. দ্বৈত নাগরিকত্ব ও অন্যান্য আইনগত বাধা
বাংলাদেশের সংবিধান ও নির্বাচন আইন অনুযায়ী দ্বৈত নাগরিকত্বধারী ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে অযোগ্য। একইভাবে, গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তির মনোনয়নও বাতিলযোগ্য।
৫. স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে ১% সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা
Representation of the People Order, 1972 অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করতে হলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটারের ন্যূনতম ১% ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর মনোনয়নপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক। এই স্বাক্ষরগুলো অবশ্যই ওই নির্বাচনী এলাকার নিবন্ধিত ভোটারদের হতে হবে এবং তা নির্ধারিত ফরম্যাটে উপস্থাপন করতে হবে।
বাস্তবে দেখা যায়, অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয় কারণ—
- প্রয়োজনীয় ১% ভোটারের স্বাক্ষর পূরণ না হওয়া,
- স্বাক্ষরকারী ভোটারদের ভোটার নম্বর বা পরিচয় সঠিকভাবে উল্লেখ না থাকা,
- একই ভোটারের স্বাক্ষর একাধিক প্রার্থীর পক্ষে ব্যবহৃত হওয়া, অথবা
- যাচাইয়ের সময় স্বাক্ষরের সত্যতা প্রমাণে ব্যর্থ হওয়া।
আইন অনুযায়ী, এই ১% সমর্থনসূচক স্বাক্ষর ছাড়া কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন গ্রহণযোগ্য নয় এবং রিটার্নিং কর্মকর্তা এ ক্ষেত্রে কোনো শিথিলতা প্রদর্শনের এখতিয়ার রাখেন না। ফলে, এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া সম্পূর্ণ আইনসম্মত বলে গণ্য হয়।
তবে, যদি প্রার্থী প্রমাণ করতে পারেন যে স্বাক্ষর যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ভুল, গণনায় ত্রুটি বা যাচাই প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি ঘটেছে, তাহলে তিনি নির্বাচন কমিশনে আপিল কিংবা প্রয়োজনবোধে হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদন করে প্রতিকার চাইতে পারেন।
মনোনয়ন বাতিলের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার
নির্বাচন কমিশনে আপিল
রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে আপিল করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ভুল, ব্যাংকিং ত্রুটি বা নথি সংশোধনের মাধ্যমে আপিলে সফলতা পাওয়া যায়। নির্বাচন কমিশনের আপিল এর রায় যদি আইনবহির্ভূত, এখতিয়ার বহির্ভূত অথবা স্বেচ্ছাচারী বা অসংগত হয়ে থাকে, তবে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট আবেদন করে প্রতিকার চাওয়া যায়। বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের একাধিক রায়ে দেখা যায়, প্রকৃত ঋণখেলাপি না হলে কেবলমাত্র প্রশাসনিক ভুলের কারণে প্রার্থীকে বঞ্চিত করা যায় না।
ঋণসংক্রান্ত সমস্যার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে দ্রুত CIB ডাটাবেজ সংশোধন করে নির্বাচন কমিশনের নিকট উপস্থাপন করা অত্যন্ত কার্যকর প্রতিকার।
সংক্ষুব্ধ প্রার্থীদের জন্য আগামী ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল গ্রহণ করবে ইসি। উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশন মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা বাতিল সংক্রান্ত আদেশের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত আপিলসমূহ ১০ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে নিষ্পত্তি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই সময়সীমার মধ্যেই আপিল কর্তৃপক্ষ প্রার্থীদের দাখিলকৃত কাগজপত্র, আইনি ব্যাখ্যা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত প্রদান করবে। ফলে মনোনয়ন বাতিলের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়ার ক্ষেত্রে এটি প্রার্থীদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক সময়কাল।
এছাড়া, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ জানুয়ারি, যার পর নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করবে। পরবর্তী ধাপে, ২১ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তারা প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ প্রদান করবেন, এবং ওই দিন থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম শুরু হবে। নির্ধারিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
মনোনয়ন বাতিল নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি আইনি প্রক্রিয়া হলেও, এটি যেন নিরপরাধ ও যোগ্য প্রার্থীর রাজনৈতিক অধিকার হরণে পরিণত না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকা জরুরি। আইন প্রার্থীদের জন্য আপিল ও বিচারিক প্রতিকার উন্মুক্ত রেখেছে। সময়মতো সঠিক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অনেক ক্ষেত্রেই মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত সফলভাবে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব।
সচেতনতা, সঠিক ডকুমেন্টেশন এবং অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ—এই তিনটি উপাদানই একজন প্রার্থীর জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়ায় টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার।



