অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নির ক্ষেত্রে একাধিক পাওয়ারদাতা ও পাওয়ারগ্রহীতার মৃত্যুজনিত আইনি প্রভাব

Power Giver Death

অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাংলাদেশের সম্পত্তি, ব্যাংকিং এবং বাণিজ্যিক লেনদেনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনগত দলিল, যা বিশেষত দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প, বিনিয়োগ, রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন এবং ক্রস-বর্ডার ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত হয়। এই দলিলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—এটি সাধারণভাবে একতরফাভাবে প্রত্যাহারযোগ্য নয় এবং নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এর কার্যকারিতা বহাল থাকে। এই প্রবন্ধে আমরা বিশদভাবে আলোচনা করব—(১) একাধিক পাওয়ারদাতা থাকলে তাদের মধ্যে কারো মৃত্যু হলে কী হবে, এবং (২) একাধিক পাওয়ারগ্রহীতা থাকলে তাদের মধ্যে কারো মৃত্যুতে আইনের অবস্থান কী। এই বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রিত হয় Power of Attorney Act, 2012-এর নীতিমালার আলোকে, যা চুক্তির ধারাবাহিকতা (continuity) ও তৃতীয় পক্ষের স্বার্থ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়।

একাধিক পাওয়ারদাতা থাকলে—কোনো একজনের মৃত্যুতে আইনি অবস্থান

যখন একাধিক ব্যক্তি (Principal) যৌথভাবে একটি অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রদান করেন, তখন সেটি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য হয়ে থাকে—যেমন জমি উন্নয়ন, বিক্রয়, বা বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা। আইনের নীতি অনুযায়ী, যদি উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পূর্বে কোনো একজন পাওয়ারদাতার মৃত্যু ঘটে, তাহলে তার ওয়ারিশগণ (legal heirs) স্বয়ংক্রিয়ভাবে মৃত ব্যক্তির স্থলাভিষিক্ত হন। তারা ঠিক একইভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন, যেন মৃত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেনি।

ধরা যাক, তিনজন জমির মালিক একটি ডেভেলপারকে অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়েছেন একটি আবাসিক প্রকল্প নির্মাণের জন্য। প্রকল্প চলাকালীন একজন মালিক মারা গেলে, তার উত্তরাধিকারীরা পূর্বের চুক্তির অধীনে বাধ্য থাকবেন এবং প্রকল্প চলমান থাকবে। এতে প্রকল্প বন্ধ হয় না, বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়ে না।

একাধিক পাওয়ারগ্রহীতা থাকলে—কোনো একজনের মৃত্যুতে আইনি অবস্থান

অন্যদিকে, একাধিক পাওয়ারগ্রহীতা (attorney) নিযুক্ত থাকলে এবং তাদের মধ্যে কোনো একজনের মৃত্যু ঘটলে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিল হয় না। বরং অবশিষ্ট জীবিত পাওয়ারগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে দলিলটি অক্ষুণ্ন ও কার্যকর থাকে। এই বিধান বাস্তব জীবনে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক ক্ষেত্রে একাধিক প্রতিনিধিকে নিয়োগ দেওয়া হয় যাতে কাজের গতি ও দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং কোনো এক ব্যক্তির অনুপস্থিতি পুরো কার্যক্রমকে ব্যাহত না করে। যেমন, একজন প্রবাসী ব্যবসায়ী তার ব্যবসা পরিচালনার জন্য দুইজন পাওয়ারগ্রহীতা নিয়োগ করলেন। তাদের একজনের মৃত্যু হলে অপরজন দলিলে প্রদত্ত ক্ষমতা অনুযায়ী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবেন, ফলে ব্যবসার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং কোনো প্রশাসনিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে না।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিক হলো—পাওয়ার অব অ্যাটর্নিতে ক্ষমতা কীভাবে প্রদান করা হয়েছে, অর্থাৎ তা যৌথভাবে (jointly) নাকি যৌথ ও পৃথকভাবে (jointly and severally)। যদি দলিলে উল্লেখ থাকে যে সকল পাওয়ারগ্রহীতাকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে, তাহলে একজনের মৃত্যুতে বাস্তবিক জটিলতা দেখা দিতে পারে, কারণ তখন অবশিষ্ট ব্যক্তিরা এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নাও হতে পারেন। কিন্তু যদি “jointly and severally” ভিত্তিতে ক্ষমতা প্রদান করা হয়, তাহলে অবশিষ্ট যে কোনো পাওয়ারগ্রহীতা এককভাবে কার্যসম্পাদন করতে পারবেন, যা বাস্তব প্রয়োগে অধিক কার্যকর ও ঝুঁকিহ্রাসকারী।

ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স ক্ষেত্রে প্রয়োগ

ব্যাংক ঋণ, মর্টগেজ বা সিকিউরিটি ডকুমেন্টে অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রায়ই ব্যবহৃত হয়। যদি কোনো পাওয়ারদাতা মারা যান, তার ওয়ারিশগণ দায়ভার বহন করেন। আবার, কোনো পাওয়ারগ্রহীতার মৃত্যু হলেও অন্যরা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেন। ফলে ঋণ পুনরুদ্ধার (loan recovery) বা নিরাপত্তা বাস্তবায়নে কোনো বাধা সৃষ্টি হয় না।

অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সংক্রান্ত এই বিধানগুলো বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থাকে একটি বাস্তবমুখী ও বিনিয়োগবান্ধব কাঠামো প্রদান করেছে। একাধিক পাওয়ারদাতা বা পাওয়ারগ্রহীতার ক্ষেত্রে কোনো একজনের মৃত্যু যেন পুরো চুক্তি বা লেনদেনকে অকার্যকর না করে—তা নিশ্চিত করাই এই আইনের মূল উদ্দেশ্য।

সঠিকভাবে খসড়া (drafting) করা এবং “joint vs several authority” স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হলে, এই ধরনের দলিল ব্যবসা, সম্পত্তি ও আন্তর্জাতিক লেনদেনে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

Facebook
WhatsApp
Twitter
LinkedIn
Pinterest

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *